চাষী নয়, লবণের দাম নির্ধারণ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা

কক্সবাজার লবণচাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী।

কক্সবাজার লবণচাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। দেশে লবণ উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি এবং সরবরাহ চেইনের বাধাগুলো নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবিএস ফরহাদ

শেষ হলো লবণ উৎপাদন মৌসুম। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লবণ দিয়ে কি দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব?

এবার লবণের মৌসুম শেষ হয়েছে। অক্টোবর-মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের মৌসুম ধরা হয়। এখন সংরক্ষণ ও চাষীদের বাড়ি ফেরার সময়। এবারো দেশের ৬৪ জেলার মানুষের চাহিদা পূরণ করার মতো লবণ উৎপাদন হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যের চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে। যদি চাহিদার তুলনায় অল্প কিছু ঘাটতি থেকেও থাকে তবে তা আগের বছরের সংরক্ষিত লবণ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব। আগের বছরের প্রায় ১০ লাখ টন লবণ গর্তে সংরক্ষিত আছে। সুতরাং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লবণ দিয়েই দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

দেশের লবণচাষী, পরিশোধনকারী ও ব্যবসায়ীরা বরাবরই লবণ আমদানির বিরোধিতা করে এসেছেন। আপনি কি মনে করেন দেশে উৎপাদিত লবণ এখানকার চাহিদা পূরণে যথেষ্ট?

এখন শিল্প লবণের নামে সোডিয়াম ডাই সালফেট আমদানি করা হচ্ছে। অথচ অনেক আগে থেকে শিল্পের এ চাহিদা পূরণ করে আসছিল দেশে উৎপাদিত লবণ দিয়ে। আগে তো দুই ক্ষেত্রেই চাহিদা পূরণ হতো দেশে উৎপাদিত লবণ থেকে। তাহলে এখন কেন বাইরে থেকে আমদানি করতে হচ্ছে? আমরা বরাবরই বলে আসছি লবণচাষীদের বাঁচাতে হলে সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ডাই সালফেট আমদানি বন্ধ করতে হবে। এছাড়া যে পরিমাণ আমদানি করা হয় তার ৯০ শতাংশ ভোজ্য লবণের সঙ্গে মিশিয়ে খাবার লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যার কারণে লবণচাষীরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। এটি বন্ধ করা না গেলে লবণচাষীরা দাম পাবেন না। চাষীরা যে লবণ কেজিপ্রতি ৪ টাকায় বিক্রি করে বাজারে গিয়ে সেটা হয়ে যাচ্ছে ৪২-৪৫ টাকা। এবারো লবণচাষীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আগামীতে লবণ চাষের পেশা পরিবর্তন করবেন অনেকে।

লবণের সরবরাহ চেইনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলো কী কী?

সাধারণত লবণ চাষের জন্য চাষীদের নিজস্ব জমি কম থাকে। তারা উৎপাদন মৌসুমে জমির মালিক থেকে জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। আবার নিজস্ব জমি থাকলেও উৎপাদন উপকরণ থাকে না। ফলে চাষীদের নির্ভর করতে হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর। প্রায় ৯৮ শতাংশ চাষী এ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যান। আর ওই মধ্যস্বত্বভোগীরাই লবণের দামটা নির্ধারণ করে দেয়। তারা মিলমালিকদের সঙ্গে যোগসাজশে ন্যায্যমূল্য থেকে কম দামে লবণ কেনে। অতিমুনাফার আশায় চাষীদের থেকে কম দামে কিনে বেশি মুনাফা করে।

লবণের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থায় কী ধরনের নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন

লবণচাষী ও ব্যবসায়ীদের ন্যায্যমূল্য পেতে হলে সরকারকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকে প্রথমত একটি ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। সে মূল্যে সরকার নিজেই সরাসরি চাষী থেকে লবণ কিনতে পারে। সরকার লবণচাষীদের বিসিক ও স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচয়পত্র করে দিতে পারে। তাদের জন্য বার্ষিক একটি ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এখানে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে সিন্ডিকেট। সরকার ছাড়া কেউ এটি ভাঙতে পারবে না। জমি বর্গা নিতে বড় একটি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। জমি বর্গা নেয়ার ব্যয় চাষীর নাগালে রাখতে হবে এবং চাষের যে উপকরণ সেগুলো সরকার নিজে ও বেসরকারিভাবে সরবরাহ করতে পারে। মিল মালিকরা যে লাগামহীন উচ্চ মুনাফা করছে সেটি টেনে ধরে চাষীদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে কীভাবে ন্যায্যমূল্য দেয়া যায়, সেটি নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব। সরকার বলেছিল লবণ পরিবহনের খরচ কমানো হবে। সেটি যদি করতে পারে তাহলে চাষীরা নিজেরাই কারখানায় গিয়ে লবণ বিক্রি করতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করার অতিরিক্ত ব্যয়েরও আর প্রয়োজন পড়বে না। এ দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটি টিকিয়ে রাখতে হবে।

আরও